আমার স্বামীকে ওরা পুড়িয়ে মেরেছে। তিন দিন হাসপাতালে যন্ত্রণায় ছটফট করতে দেখেছি। শরীরের রক্ত ঝরে ঝরে শেষ হয়ে গেছে। সেই দৃশ্য আমি কোনো দিন ভুলতে পারব না। শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলার তিলই গ্রামের ওষুধ ব্যবসায়ী ও বিকাশ এজেন্ট খোকন চন্দ্র দাসের স্ত্রী সীমা রানী দাস গতকাল সোমবার সমকালকে এসব কথা বলেন।
গত শনিবার সকালে জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে মারা যান খোকন। বিকেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত হয়। রাত সাড়ে ৮টার দিকে লাশবাহী গাড়ি গ্রামে পৌঁছায়। রাত ১০টার দিকে বাড়ির আঙিনায় শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়।
পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে শরীয়তপুরের ডামুড্যার তিলই গ্রামে খোকন চন্দ্রের পরিবারের সংসারের চাকা যেন থেমে গেছে।
তিন সন্তান– আকাশ (১৫), বিকাশ (১০) ও আদর (৫)। তাদের ভবিষ্যৎ বাবার আয়ের ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠছিল। কে পড়াশোনার খরচ জোগাবে, তা এখন অনিশ্চয়তার মুখে। কে সংসার চালাবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় স্ত্রী। কে ওষুধের খরচ জোগাবে, তা ভাবছেন বৃদ্ধ বাবা-মা। কে দেবে আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা– এই দুশ্চিন্তা পরিবারটিকে গ্রাস করছে।
ছোট দোকান ছিল পরিবারের শেষ সম্বল ও বেঁচে থাকার ভরসা। সেই দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ার পথে। ফলে পরিবারটির অনিশ্চয়তা ক্রমে বাড়ছে।
খোকন দাসের মেজ বোন অঞ্জনা রানী দাস কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তাঁর ভাই খোকন ছিলেন সহজ-সরল ও ভদ্র প্রকৃতির মানুষ। তিনি কখনও কারও সঙ্গে ঝামেলায় জড়াননি। সংসার চালাতে দিন-রাত পরিশ্রম করে গেছেন শুধু সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে। তিনি আরও বলেন, ‘আমার ভাইয়ের তিনটি ছোট সন্তান। আজ সে নেই; এখন ওদের কী হবে, কোথায় যাবে, কীভাবে থাকবে, কী খাবে– এই প্রশ্নগুলো আমাদের আক্রান্ত করছে।’
নিহত খোকনের বাবা পরেশ চন্দ্র দাস জানান, পরিবার নিয়ে এখন কোথায় দাঁড়াবেন, কীভাবে সংসার চালাবেন– তা ভেবেই তিনি দিশেহারা। প্রতিদিনের খাবার থেকে শুরু করে চিকিৎসা, শিক্ষা– সবকিছুই এখন প্রশ্নের মুখে।
তিন আসামির দুদিনের রিমান্ড
এই হত্যা মামলায় তিন আসামিকে দুদিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। গত রোববার রাতে শরীয়তপুর মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আয়েশা আক্তার গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা স্বপন মল্লিক তিন আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চান।
এ বিষয়ে ডামুড্যা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রবিউল হক জানান, আসামিদের রিমান্ডে পেয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, এটি পরিকল্পিত ছিনতাই। পরে আসামিদের চিনে ফেলায় হত্যার উদ্দেশ্যে আগুন ধরানো হয়েছে।
ডামুড্যা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সালাউদ্দিন আইয়ূবী বলেন, এই হত্যাকাণ্ডে শোকাহত ও মর্মাহত। তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ সার্বিক সহযোগিতায় জেলা-উপজেলা প্রশাসন বদ্ধপরিকর। এরই ধারাবাহিকতায় জেলা প্রশাসকের নির্দেশে নিহত খোকনের সৎকারের জন্য উপজেলা প্রশাসন পরিবারকে ২০ হাজার টাকা অনুদান দিয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বুধবার রাতে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে খোকনকে ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর চিৎকারে স্থানীয়রা ছুটে এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়।