নওশাদ জামিল
দুই সন্তান রুমি ও জামি, স্বামী শরীফ ইমামকে নিয়ে সাজানো-গোছানো সুন্দর সংসার ছিল তাঁর। তবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তাঁর সংসারের সব আলো নিভিয়ে দেয়। বড় ছেলে শাফী ইমাম রুমি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে শহীদ হন, অত্যন্ত মেধাবী পুত্র রুমির চিন্তায় স্বামী শরীফ ইমামও অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তারপর একে-একে যেন জীবনের সব রঙ ফিকে হয়ে যায় তাঁর, তবু ওই রঙহীন জীবন থেকেই জন্ম নেয় এক অনন্য আলো ‘শহীদ জননী’ জাহানারা ইমাম।
জেন-জি প্রজন্ম কতটুকু জানে জাহানারা ইমামকে? কতজন পড়েছে তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘একাত্তরের দিনগুলি’? সত্যি বলতে, অধিকাংশই হয়তো পড়েনি। হয়তো তাঁর নামও জানে না অনেকেই। এ ব্যর্থতা তরুণ প্রজন্মের নয়; এ ব্যর্থতা আমার, আপনার ও অনেকেরই।
এ কথা একবিন্দু মিথ্যা নয়, যতদিন বাংলাদেশ টিকে থাকবে ততদিন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও থাকবে। এ ইতিহাসে কিছু নাম সময়ের সীমানা পেরিয়ে অনন্ত হয়ে আছে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। তিনি শুধু একজন লেখক, শিক্ষিক বা শহীদের মা নন, তিনি এক সংগ্রামী আত্মা, যিনি শোককে পরিণত করেছিলেন প্রতিবাদের শক্তিতে, ব্যথাকে রূপ দিয়েছিলেন অনুপ্রেরণায়।
১৯৭১ সালে যখন যুদ্ধ শুরু হয়, তখন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র রুমির যুক্তরাষ্ট্রে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে যাওয়ার ঠিক হয়ে ছিল। রুমি যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে চ্যান্স পান। উচ্চশিক্ষার জন্য স্কলারশিপ পান। তবে দেশের ভয়াবহ অবস্থা দেখে তিনি আর বিদেশে যেতে চাননি। মায়ের কাছে তাই তিনি বিদেশে পড়তে যাওয়ার বদলে অনুমতি চান যুদ্ধে যাওয়ার। জাহানারা ইমাম তখন বলেছিলেন, ‘দিলাম তোকে দেশের জন্য কোরবানি। যা, তুই যুদ্ধে যা।’
মেঘালয় থেকে ট্রেনিং নিয়ে মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন রুমি। ঢাকায় একাধিক গেরিলা সফল অপারেশনে অংশ নেন, কাঁপিয়ে দেন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে। একপর্যায়ে তিনি ধরা পড়েন। তারপরের ইতিহাস জানা আছে অনেকেরই।
স্বামী-সন্তানহারা জাহানারা ইমাম শোকের ভারে নত না হয়ে, বুকভরা আর্তনাদ গোপন রেখে কলম ধরেছিলেন, লিখেছিলেন ‘একাত্তরের দিনগুলি’। এ বই নিছক কোনো দিনলিপি নয়, এটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস। এতে যেমন আছে মায়ের হৃদয়ের বেদনা, তেমনই আছে সাহস, ত্যাগ, আর মুক্তির আহ্বান।
‘একাত্তরের দিনগুলি’ যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা জানেন, এ বইটি পড়লে চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক মা, যিনি প্রতিদিন মৃত্যুভয় পেরিয়ে স্বাধীনতার প্রহর গুনছেন। তাঁর লেখায় যেমন আছে যুদ্ধক্ষেত্রের গর্জন, তেমনই আছে ঘরের ভেতরের নীরব কান্না।
‘একাত্তরের দিনগুলি’ তাই শুধু সাহিত্য নয়, এটি বাংলাদেশের আত্মজীবনী। প্রতিটি পৃষ্ঠা পাঠককে নাড়া দেয়, বারবার মনে করিয়ে দেয় স্বাধীনতার মূল্য কতটা গভীর, কতটা রক্তে লেখা।
জাহানারা ইমামের ব্যক্তিজীবনে ছিল অকল্পনীয় সংগ্রাম। একদিকে ছিল স্বামী-পুত্র হারানোর শোক, অন্যদিকে ছিল ক্যান্সারের সাথে লড়াই। তবে এটাই মূল লড়াই ছিল না তাঁর। প্রকৃত লড়াই ছিল একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গণ-আন্দোলন গড়ে তোলা। ক্যান্সার আক্রান্ত শরীর নিয়েও তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে রাজপথে নেমেছিলেন। ১৯৯২ সালে গঠিত একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নেতৃত্বে তিনি পরিণত হন গণআন্দোলনের প্রতীকে। তাঁকে ঘিরে সংগঠিত হয় এক নতুন প্রজন্ম, তাঁকে সামনে রেখে লাখো বাঙালি বলে উঠেছিল ‘জয় আমাদের হবেই।’
রাজপথে পুলিশের পিটুনি, মামলা, হয়রানি ইত্যাদি কোনো বিপত্তিই দমাতে পারেনি জাহানারা ইমামকে। তিনি জানতেন, সত্যের পথ কঠিন, কিন্তু পরাজয়ের নয়। একদিকে মৃত্যুর ছায়া, অন্যদিকে রাষ্ট্রযন্ত্রের চাপ সবকিছু উপেক্ষা করে তিনি লড়াই করে গেছেন শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত। তাঁর শরীর ক্ষীণ হচ্ছিল, ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে তাঁকে টেনে নিচ্ছিল, কিন্তু কণ্ঠে ছিল অবিচল দৃঢ়তা, বিশ্বাস ছিল অটুট।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক হাসপাতালে যখন তিনি মৃত্যুর প্রহর গুণছিলেন, তখনও তিনি লিখে যান আন্দোলনের সহযোদ্ধাদের উদ্দেশে সেই চিরস্মরণীয় বার্তা, ‘আমার মৃত্যুর পরও আন্দোলন থামিও না, জয় আমাদের হবেই।’ এ একটি বাক্য যেন আজও প্রতিধ্বনিত হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসম্পন্ন প্রতিটি মানুষের মনে।
এ কথা আমরা জানি, জাহানারা ইমামের কাছে দেশপ্রেম মানে শুধু পতাকা নয়, ন্যায় ও মানবিকতার পক্ষে দাঁড়ানো। তিনি জানতেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না হলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অসম্পূর্ণ থাকবে। এ বিশ্বাস থেকেই তিনি লড়েছিলেন, এ লড়াই তাঁর মৃত্যুর পরও থামেনি। এ লড়াই এখন কি থেমে গেছে?
জাহানারা ইমামের জীবন থেকে শেখার আছে অনেক কিছু। তিনি আমাদের শেখান, দুঃখকে ভয়ের কারণ নয়, শক্তিতে রূপ দিতে হয়। তিনি শেখান, অন্যায়ের বিরুদ্ধে একা দাঁড়ানোও একধরনের জয়। এবং তিনি প্রমাণ করেছেন একজন মা থেকেও জন্ম নিতে পারে এক জাতির বিবেক।
জাহানারা ইমাম শুধু তাঁর সময়ের নন, প্রতিটি প্রজন্মের জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম। আজও যখন সমাজে অন্ধকার নামে, যখন মানুষ ন্যায়ের বিশ্বাস হারায়, তখন তাঁর দৃঢ় মুখ, তাঁর কলমের ভাষা মনে করিয়ে দেয়, মানুষকে ভয় নয়, সত্যকে ভালোবাসো।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ধর্মনিরপেক্ষ, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের যে স্বপ্ন জাহানারা ইমাম দেখেছিলেন, তা এখনো আমাদের পথের আলোকবর্তিকা।
জাহানারা ইমামের জীবন তাই কোনো একক নারীর গল্প নয়; এটি এক জাতির পুনর্জন্মের ইতিহাস। তিনি পুত্রহারা মা, তবু শোকের নয়, তিনি জাগরণের মা। তাঁর কলমের কালিতে রক্তের গন্ধ আছে, কিন্তু ওই রক্তই দিয়েছে আমাদের স্বাধীনতার রঙ।
স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি যখন আবারও হামলে পড়েছে, নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তখন নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সত্য শোনাতেই হবে। এ সত্য ইতিহাসের কেন্দ্রে জাহানারা ইমামের নাম না উচ্চারণ করা মানেই ইতিহাসকে অসম্পূর্ণ রাখা।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ পড়লাম, জাহানারা ইমামের স্মৃতি-স্মারক নীরবেই ধ্বংস করে দিয়েছে বাংলা একাডেমি। তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা অন্তত ২০টি বাংলা ও ইংরেজি বই বাংলা একাডেমি থেকে বিক্রি হয়ে গেছে কেজি দরে। স্বাধীনতাবিরোধী চক্র রসিকতা করে তাঁকে বলত ‘জাহান্নামের ইমাম’, ক্ষমতা পেয়ে চক্রটি তাঁর স্মৃতি মোছার চেষ্টা করবে, এটা কি আপনার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়?
জাহানারা ইমাম সবসময়ই সমান প্রাসঙ্গিক। কেননা, তিনি আমাদের শেখান ভালোবাসা, ন্যায় আর একাত্তরের পক্ষে রাজপথে নামলে মৃত্যুও পরাজিত হয়। তিনি আমাদের শেখান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি যতবার ধ্বংস করার চেষ্টা হবে, ততবার জেগে উঠবে তাঁর অমরগ্রন্থ। জয়তু শহীদ জননী, জয়তু জাহানারা ইমাম।