হাসনাত নাগাসাকি
ধরি, ২০২৪ এর মার্চ মাসে একটা ১০০% ফেয়ার ইলেকশন হলো। আওয়ামীলীগ কত আসন পেত? যত আসনই পাক, আওয়ামীলীগ জিততো না। হয়তো বাজেভাবেই হারতো। কারণ,
১. দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে নতুন জেনারেশন অন্যদের শাসনামল দেখেনি। ফলে তাদেরকে ধারণা দেয়া হয়েছে – আওয়ামীলীগ ফ্যাসিস্ট, দুর্নীতিবাজ, লুটপাটকারী, নিপিড়ক দল।
এসব একেবারেই হয়নি – তা বলছি না।
২. ক্ষমতায় থেকে আওয়ামীলীগ বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধের কথা ‘বেশি বেশি’ বলতো।
এই ‘বেশি বেশি’ একটা আপেক্ষিক বিষয়। যেহেতু বিএনপি জামাত ক্ষমতায় থাকলে ‘বেশি বেশি’ মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা করতো, ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতো – সেটার সাথে তুলনায় গেলে আওয়ামীলীগের মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর নাম নেয়া ‘বেশি বেশি’ মনে হতে পারে।
নতুন জেনারেশনকেও বুঝানো হয়েছে – ‘ আওয়ামীলীগ একই ঢোল বাজিয়ে কান ঝালাপালা করে দিলো’। কিন্তু, তাদের কাছে আওয়ামীলীগ মেসেজ ক্লিয়ার করতে পারেনি যে – বিএনপি জামাত কিভাবে মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, আমাদের সংস্কৃতি কিভাবে ভুলিয়ে দিতে উদ্ধত হয়।
ফলে, নতুন জেনারেশন সেই বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল।
৩. বাঙালি ভুলো মনা জাতি।
আওয়ামীলীগের দীর্ঘ ক্ষমতার ফাঁকে তারা ভুলেই গেছে – মাত্র ১৫ বছর আগে তারা ২ বেলা খেতে পেতো না।
যারা টুকটাক পড়াশোনা করে – তারাও একসময় জানতো আমাদের গড় আয় কত ছিলো, দারিদ্রতার হার কত ছিলো, জিডিপি কত ছিলো, রাষ্ট্রীয় রিজার্ভ কত ছিলো।
কিন্তু, পেটে ভাত পড়ার পরে তারাও ভুলে গেছে অতীত। আর যারা নতুন জেনারেশন, তাদের পক্ষে এটা জানা কঠিন৷
৪. নারীরাও ভুলে গেছিলো – ১৫ বছর আগে নারীদের শিক্ষার হার কত ছিলো, নারী স্বাধীনতার সূচক কত ছিলো, চাকরি ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণের হার কত ছিলো, নারী নির্যাতনের সূচক কত ছিলো, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার সূচক কত ছিলো।
৫. ওভারঅল সবাই ভুলে গেছিলো – আমাদের শিক্ষার হার কত ছিলো, কর্মক্ষেত্র কত ছিলো, বেকারত্ব কত ছিলো, আয়-ব্যায়ের পার্থক্য ১৫ বছর আগে কত ছিলো।
এগুলো যাদের এখনো মনে পড়েনি – তারা হাতের ফোনে গুগলে সার্চ দিলেই জেনে যাবেন, এবং চমকে উঠবেন। দেড় বছর পর, আজ যদি একটা ১০০% ফেয়ার ইলেকশন হয় – আওয়ামীলীগ কত আসন পাবে? আমার বিশ্বাস আওয়ামীলীগ এককভাবে ২০০ আসনের বেশি পাবে।
কারণ, ঠিক উপরের পয়েন্টগুলোর উলটো। অর্থাৎ, মানুষ শুধু বুঝে ফেলেনি – মানুষ হাড়েহাড়ে টের পেয়ে মনে করতে পারছে তাদের ১৫ বছর আগের অতীত। তারা মনে করতে পারছে –
১৫ বছর আগে এ দেশে শুধু লুটপাট হতো না – হতো পুকুর চুরি। সেটা গত দেড় বছরে দেশের অবস্থা না দেখলে তাদের মনে পড়তো না। ১৫ বছর আগে – এ দেশে কাজের ক্ষেত্র ছিলো না, বেকারত্ব ছিলো গলা পর্যন্ত। রাষ্ট্রীয় রিজার্ভ কত ছিলো তা গুগলে সার্চ দিলেই জানবেন। ১৫ বছর আগে শিক্ষার হার, নারী স্বাধীনতার সূচক, নারী শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ, নারী নিরাপত্তার সূচক কত ছিলো এই দেড় বছরের নারীরা হাড়েহাড়ে টের পেয়ে অতীত মনে পড়েছে।
শিল্পায়ন এবং অবকাঠামোর উন্নয়নের ভিতর দিয়ে গিয়েও জনগণ যেটা বুঝতে পারেনি – দেড় বছরে কলকারখানা বন্ধ হয়ে, বেকার হয়ে, অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ার পর তারা সেসব টের পেয়েছে।
শিক্ষার হার কত ছিলো, কত হয়েছে তা গুগল করে জেনে নেবেন। কিন্তু শিক্ষাখাত নিয়ে শেখ হাসিনার কি প্ল্যান ছিলো তা আলাদা বিশদ আলোচনা করতে হবে। এটা খুব খুব খুব গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক প্রসঙ্গ। ওভারওল মারা খেয়ে মানুষের মনে পড়েছে ১৫ বছর আগে কোথায় ছিলো, ১৫ বছর পরে কোথায় পৌঁছেছে এবং জাস্ট বিগত দেড় বছরে কোন তলানিতে পৌঁছেছে।
মানুষ যথেষ্ট টের পেয়েছে। মানুষের মনে পড়েছে ১৫ বছর আগের অতীত। মনে পড়েছে ২ বেলা ভাত খেতে কষ্ট হতো তাদের। মনে পড়েছে তাদের সন্তানের শিক্ষার হার, তাদের আয় ব্যায়ের দূরত্ব। এসব তাদেরকে মনে করিয়ে দিয়েছে মাঝের এই দেড় বছর। তারা মারা খাওয়ার পর, ভুক্তভোগী হওয়ার পর খানিক মনে করার চেষ্টা করছে, খানিক ব্রেইন খাটানোর চেষ্টা করছে, খানিক বাস্তবতার নিরিখে ঘেটেঘুটে বিবেচনা করার চেষ্টা করছে। কিন্তু তাও আমি চাই – আওয়ামীলীগ এখন ক্ষমতায় না আসুক। কারণ, বাঙালি শুধু টের পাওয়ার পর কিছু পেয়ে গেলে সেটা মূল্যায়ন করতে পারে না। তাদের প্রয়োজন হয় চরমভাবে টের পাওয়া। তাদেরকে চরমভাবে টের পেতে দেয়া উচিত। হাড়েহাড়ে টের পেতে দেয়া উচিত। তাহলে তারা নিজের হাতে, নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে, চাঁদা তুলে একদিন বঙ্গবন্ধু এবং শেখ হাসিনার ভাস্কর্য গড়ে তুলবে – যেটা আর কখনো ভাঙা হবে না।